আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ অবলোপন, খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হতে হবে

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ অবলোপন, খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হতে হবে

নন-ব্যাংক আর্থিক খাতে বিপুল অঙ্কের ঋণ অবলোপনের বিষয়টি উদ্বেগজনক। কারণ এটি খেলাপি ঋণ কম দেখানোর একটি কৌশল। সচরাচর ব্যাংকগুলো এ কৌশলী অবস্থান নিয়ে থাকে।এবার নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সেই পথ অনুসরণ করল। ২০১৯ ও ২০২০-এ দুই বছরে এ ধরনের ১৯টি প্রতিষ্ঠানের অবলোপনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।বস্তুত অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা যে ভালো নয়, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনেই প্রকাশ পেয়েছে।এতে বলা হয়েছে-লাগামহীন ঋণ জালিয়াতি, দুর্বল অভ্যন্তরীণ শাসন ও করোনার প্রভাবে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধাক্কা লেগেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। উপরন্তু খেলাপি ঋণ ও লিজ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ও প্রভিশন খাতে অর্থ আটকে থাকার পরিমাণও বেড়েছে। বস্তুত এ পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশের ৩৪টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকায়।এর সঙ্গে উল্লিখিত অবলোপন যোগ করলে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত খেলাপি ঋণ ১২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি অশনিসংকেত। কারণ দেখা গেছে, ঋণ অবলোপনের বিপুল পরিমাণ টাকা থেকে যায় অনাদায়ি।বস্তুত এ দেশে ঋণ অবলোপন মানেই ধরে নেওয়া হয় ওই টাকা আর আদায় হবে না। এসব মন্দঋণের কথা আর কেউ মনেও রাখে না। অসৎ ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নেয়। এই ঋণ যেন পরিশোধ করতে না হয়, সেজন্য তারা সময়ক্ষেপণ করে। বেশির ভাগ সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা করে। এ সময় আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে টাকা পরিশোধে গড়িমসি করে মন্দ ব্যবসায়ীরা।এভাবে কেটে যায় বছরের পর বছর। এরপর অলিখিত ব্যবস্থায় অবলোপনের পথে হাঁটে উভয় পক্ষই। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে চলে।বর্তমানে দেশে ৩৪টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করলেও জানা গেছে, এর মধ্যে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের আস্থা অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে। বাকিদের অবস্থা কেন নড়বড়ে হলো, তা নিবিড়ভাবে পরিদর্শন ও পর্যালোচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা উচিত। মানুষ সঞ্চয় করে মূলত লাভের আশায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, প্রত্যাশিত লাভ তো দূরের কথা, আমানতকারীদের আসলের ঘরেই টান পড়েছে।এভাবে চলতে থাকলে সরকার অনুমোদিত এসব নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা শূন্যের কোঠায় নেমে যাবে; একই সঙ্গে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি হবে ক্ষতিগ্রস্ত।খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি অর্থনীতির এক দুষ্টু ক্ষত। এর বড় অংশই ইচ্ছাকৃত। চিন্তার বিষয় হলো, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের টাকা আদায়ে আইনি সহায়তা পাওয়া যায় না। তাই অধিকতর যাচাই-বাছাই করে ঋণ দেওয়া উচিত বলে মনে করি আমরা। সেই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়ে আরও বেশি কঠোর হওয়া প্রয়োজন। কারণ খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার কারণেই অবলোপনের হার বাড়ছে।

Please follow and like us:
0
20
Pin Share20

Leave a reply

Minimum length: 20 characters ::
RSS
Follow by Email
YOUTUBE
PINTEREST
LINKEDIN