এলএনজি ঘাটতিতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমেছে ১৫%

এলএনজি ঘাটতিতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমেছে ১৫%

গত এক সপ্তাহে জাতীয় গ্রিডে আমদানীকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দৈনিক সরবরাহ কমেছে ১০ কোটি ঘনফুটের বেশি। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে না পারায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এ পরিস্থিতি বজায় থাকবে বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। গ্যাসের এ সরবরাহ ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প-কারখানাগুলোয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। তীব্র ভোগান্তির সম্মুখীন হচ্ছেন আবাসিক গ্রাহকরাও।বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম এখনো ঊর্ধ্বমুখী। আমদানি কমায় জাতীয় গ্রিডেও এলএনজির সরবরাহ এখন কম। ডিসেম্বরের আগে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনাও তেমন একটা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। পেট্রোবাংলারও এ মুহূর্তে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে জ্বালানিটি সংগ্রহের কোনো পরিকল্পনা নেই।এ বিষয়ে সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন এলএনজির দাম ১৪ ডলারের (প্রতি এমএমবিটিইউ) আশপাশে ওঠানামা করছে। এত উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনে সরবরাহ করার কোনো পরিকল্পনা এ মুহূর্তে আমাদের নেই। ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্যাসের সংকট থাকবে। শীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় গ্যাস ব্যবহার এমনিতেই কমে যায়। এর মধ্যে বিশ্ববাজারে দাম কমলে সংকটও কমে যাবে।
সাধারণত স্পট মার্কেট ও জি-টু-জি চুক্তির ভিত্তিতে এলএনজি সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। জাতীয় গ্রিডে স্থানীয় পর্যায়ে উত্তোলিত গ্যাসের পাশাপাশি আমদানীকৃত এলএনজি সরবরাহ হওয়ার কথা দৈনিক ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে চলতি বছরের শুরুতেই ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে এলএনজির দাম। এর ধারাবাহিকতায় জানুয়ারির শুরুতে জাতীয় গ্রিডে এলএনজির দৈনিক সরবরাহ কমে দাঁড়ায় ৩৮৯ মিলিয়ন ঘনফুটে। মার্চের শেষ নাগাদ স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে ক্রয়কৃত এলএনজিবাহী একটি কার্গো মহেশখালীর টার্মিনালে এসে ভেড়ে। এর ধারাবাহিকতায় এপ্রিলের শুরুতে আবার জাতীয় গ্রিডে জ্বালানিটির দৈনিক সরবরাহ বেড়ে দাঁড়ায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। এরপর এক সপ্তাহ আগ থেকে আবারো সরবরাহ কমতে থাকে জ্বালানিটির।পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস উৎপাদন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি মাসের প্রথম দিনে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ করা হয়েছে ৬৯৪ মিলিয়ন ঘনফুট। পরদিন (২ সেপ্টেম্বর) ৯২ মিলিয়ন ঘনফুট কমে সরবরাহ নেমে আসে ৬০২ মিলিয়ন ঘনফুটে। এরপর সর্বশেষ গতকাল সরবরাহ হয়েছে ৫৮৮ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমেছে ১০৬ মিলিয়ন ঘনফুট।এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার ওই কর্মকর্তা বলেন, এলএনজির সংকটটা মূলত স্পট মার্কেট থেকে স্বল্প মূল্যে কিনতে না পারায়। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট করে এলএনজি সরবরাহ করা হবে। এর আগে সংকট কাটবে না। নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হচ্ছে। কাজও শুরু হয়েছে।সংকটকালীন বণ্টন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পেলেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয়। বর্তমানে দেশে ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির আওতায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ৮০টির বেশি। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে এর অর্ধেক।পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দেশের গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর আওতাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় গ্যাসের চাহিদা ছিল ২ হাজার ২৫২ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে ১ হাজার ৫৯ মিলিয়ন ঘনফুট। এ সময় তিতাসের আওতাধীন এলাকার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় গ্যাসের চাহিদা ছিল ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরবরাহ হয়েছে ৩৩৯ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাস সংকটের কারণে সংস্থাটির আওতাধীন বেশকিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায়ই বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী ইকবাল মো. নুরুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাস সংকট শুরু হয়েছে। গ্যাস সংকট আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকতে পারে। তিতাসের নিজের যে চাহিদা তা থেকে গ্যাস অনেক কম পাওয়া যাচ্ছে। মূলত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করতে না পারায় সংকট বেড়েছে। তিতাসের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৭০০-৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে জিটিসিএল থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে ৫০০-৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। শিল্প খাতের দশাও তথৈবচ। গত এপ্রিল থেকেই গ্যাসের চাপস্বল্পতায় ভুগছে খাতটি। বিশেষ করে শিল্প এলাকায় নির্ধারিত চাপের কম গ্যাস সরবরাহ হওয়ায় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। শিল্প অধ্যুষিত গোটা গাজীপুর এলাকায় কম-বেশি গ্যাসের অপ্রতুল চাপ নিয়ে সমস্যা রয়েছে গত এপ্রিল থেকে। এতে ভুগতে হচ্ছে পোশাক শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বস্ত্র খাতের সুতা-কাপড় উৎপাদনকারী কারখানাগুলোকে। গাজীপুরের টেক্সটাইল মিলগুলোর গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআইয়ের পরিবর্তে তখন ৩-৫-এ নেমে আসে।বস্ত্র খাতের শিল্প মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সদস্যদের দেয়া তথ্যমতে, বড় স্পিনিং, উইভিং ও ডায়িং-প্রিন্টিং-ফিনিশিং মিলগুলোয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। এসব মেশিনারিজের নিরাপদ ও সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন নিজস্ব খরচে অবকাঠামো নির্মাণ করে গ্যাস দিয়ে অত্যাধুনিক জেনারেটর ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির সমন্বয়ে ক্যাপটিভ পাওয়ার জেনারেশনের মাধ্যমে মিল পরিচালনা করে আসছে। ক্যাপটিভ পাওয়ার জেনারেশনের জন্য গ্যাসই হচ্ছে মুখ্য জ্বালানি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশকিছু মিলে উৎপাদন চালু রাখাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।এদিকে এলএনজি সরবরাহ সংকট প্রকট হওয়ায় দুই সপ্তাহ ধরে রাজধানীর আবাসিক শ্রেণীর গ্রাহকরা গ্যাস সংকটে ভুগছেন। বিশেষত সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ থাকে না বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।তিতাসের একটি সূত্রও বলছে, গ্যাস সংকট শুরু হলে ব্যবস্থাপনা করতে গিয়ে মূলত আবাসিক শ্রেণীর গ্রাহকরাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হন। মূলত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে শুরুতেই প্রাধান্য দেয়া হয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে। এরপর শিল্প গ্রাহকদের। সবচেয়ে কম প্রাধান্য পান আবাসিক গ্রাহকরা। ফলে আবাসিকে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। তখনই ভোগান্তিতে পড়েন গ্রাহক।গ্যাস সরবরাহ সংকটের বিষয়টি এরই মধ্যে টের পেতে শুরু করেছেন আবাসিক গ্রাহকরা। শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. আজগার ইসলাম জানিয়েছেন, সকাল ৮টার দিকে গ্যাসের চুলা কোনোভাবেই জ্বালানো যায় না। অনেক চেষ্টার পর জ্বালানো গেলেও তা নিবু নিবু অবস্থায় থাকে। তাতে কিছুই রান্না করা যায় না। সকাল গড়িয়ে দুপুর পর্যন্ত এ অবস্থা থাকে। তারপর কিছুটা গ্যাসের চাপ পাওয়া যায়।

Please follow and like us:
0
20
Pin Share20

Leave a reply

Minimum length: 20 characters ::
RSS
Follow by Email
YOUTUBE
PINTEREST
LINKEDIN