Search
Saturday 6 June 2020
  • :
  • :

হাকিম নড়ে, হুকুমও নড়ে – এটি ক্রিয়ার বিপরীত প্রতিক্রিয়া মাত্র

–রিন্টু আনোয়ার–

জামিন না দেয়ায় তিন ঘন্টার মধ্যে বদলে দেয়া হলো বিচারককে। কেবল বদলি নয়। স্ট্যান্ড রিলিজসহ ওএসডি। পাল্টে গেল রায়ও। হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না- শৈশবের পাঠটি মিথ্যা এখন হয়ে গেল পিরোজপুরে। হাজার বছরের এই পাঠ বদলে গেল কোনো ঘোষণা ছাড়াই। ছন্দবদ্ধ সেই পাঠটার আপডেট হচ্ছে- এখন হাকিম নড়ে হুকুমও নড়ে। তাই হাকিম-হুকুম দুইটাই নড়ার এই পাঠ নিতে হবে নতুন প্রজন্মকে।দুর্নীতির মামলায় ৩ মার্চ পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক এমপি আউয়াল ও তার স্ত্রী লায়লা পারভীনের জামিনের আবেদন নাকচ করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছিলেন জেলা জজ আব্দুল মান্নান। এরপর বিক্ষোভ-ভাংচুরে নামে আউয়ালের সমর্থকরা। উদ্ভুদ্ধ প্রেক্ষাপটে তাৎক্ষণিক বদলি করে দেয়া হয় জজ আব্দুল মান্নানকে। দ্রুততার সঙ্গে নাহিদ নাসরিনকে ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজের দায়িত্বে বসানো হয়। তিনি আওয়ামী লীগ নেতা আউয়াল ও তার স্ত্রীকে তাৎক্ষণিক জামিন দিয়ে দেন। বিষয়টি রীতিমত তুঘলকি কান্ড। অভূতপূর্ব ঘটনা।আউয়াল দম্পতির বিরুদ্ধে জাল দলিল করে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের মামলাটি করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। মামলাটি বিএনপি আমলের নয়। ওয়ান–ইলেভেন সরকারের করাও নয়। বর্তমান সরকারের আমলে করা এই মামলায় সম্প্রতি আউয়াল দম্পতি হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিয়ে পিরোজপুরে বিশাল শো-ডাউন করে হিম্মতের জানান দেন। ওই শো-ডাউনে ছিল দুই সহস্রাধিক মোটরসাইকেল, অর্ধশতাধিক গাড়ি। পিরোজপুরের আদালতে জামিন বাতিলের এ রায়ের পর ভাঙচুর করা হয় সরকার দলীয় সংসদ সদস্য শ. ম রেজাউল করিমের স্থানীয় অফিস। তিনি সম্প্রতি গণপূর্ত দপ্তরের মন্ত্রিত্ব হারিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মন্ত্রী হিসাবে রয়েছেন।৩ মার্চে পিরোজপুরের আদালত কক্ষে ছিল উপচে পড়া ভিড়। শুনানিতে আউয়াল দম্পতির পক্ষে কাতারে কাতারে শামিল হন স্থানীয় আইনজীবীরা। অংশ নেন জেলা বারের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, জিপিসহ একজন সাবেক পিপি, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বারের সাবেক সভাপতিসহ প্রায় ২৫ জন আইনজীবী। অথচ দুঃসাহসিকভাবে জামিন নামঞ্জুর করে দেন জেলা জজ আবদুল মান্নান। এতে বিষাদের ছায়া নেমে আসে আউয়াল সমর্থকদের মধ্যে। বাইরে চলে বিক্ষোভ। সড়ক অবরোধ করে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। রাজপথে এমন ত্রাসের পাশাপাশি আদারতপাড়ায় উত্তেজনা আইনজীবীরা আসামীদের পক্ষে গিয়ে আদালত বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। পরিস্থিতি দেখে মনে হয়েছে সবই ছিল পরিকল্পিত। এরপর ১৫ মিনিটের ব্যবধানে ঘটলো দুটি ঘটনা। জামিন নামঞ্জুর হওয়ামাত্রই আউয়াল দম্পতির অসুস্থতা পর্ব। জমা দেয়া হয় তাদের মেডিকেল রিপোর্ট। উদ্দেশ্য কারাগারে গেলেও হাসপাতালে ঢুকে পড়ার। উদ্দেশ্যে সাফল্য আসে। কারাগারে পাঠানোর আদেশে আসে পরিবর্তন। তাদেরকে হাসপাতালে রাখার আদেশ হয়। তারা উভয়ে ডিভিশন পেলেন। নিশ্চিৎ হয় হাসপাতালবাস। অর্থাৎ হাকিম থাকতেই হুকুম একটু নড়ে উঠলো। এর ফাঁকে সরকারের ভেতরে সক্রিয় হয়ে ওঠে আরেক সরকার। আদেশদানের ১৫ মিনিট পরেই আসলো বিচারকের স্ট্যান্ড রিলিজ। বিচারকের চেয়ে রাষ্ট্রের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো সরকারী দলের একটি জেলা কমিটির সভাপতির চাওয়া-পাওয়ার বিষয়।কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দুর্নীতিতে অভিযুক্ত আউয়াল দম্পতির প্রতি সরকার ও রাষ্ট্রকে কেন এতো বড় অবদান রাখতে হলো? বুঝলাম সাবেক এমপি আউয়াল স্থানিয় বড় নেতা। কিন্তু তিনি কি এত বড় নেতা যে তার জন্য রাষ্ট্রকে আপন নিয়ম ভাঙার ঝুঁকি নিতে হলো? জামিন নামঞ্জুরের আদেশের পর পরই পিরোজপুরের জেলা ও দায়রা জজকে বদলি, আরেকজনকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা এবং নতুন বিচারকের জামিন মঞ্জুরের ঘটনা তাই এখনো দেশজুড়ে আলোচনায়। উপরের ঘটনাগুলো ঘটেছে মাত্র ঘন্টা কয়েকের মধ্যে। এদিকে ঘটনাকে মামুলি-স্বাভাবিক বোঝাতে আইনমন্ত্রী ‘দাদাকে আদা পড়া’ দেয়ার মতো বক্তব্য দিয়েছেন। আগের আইনমন্ত্রীসহ আইনআদালত সম্পর্কে অভিজ্ঞ সচেতনরা বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা তাদের স্মরণাতীত। পিরোজপুরের ঘটনায় দেশের বিচার ব্যবস্থার জানাজা বা দাফন হয়ে গেছে-এমন সরল কথা বলার সময় কিন্তু এখনো আসেনি। কারণ এই পিরোজপুরের ঘটনাই শেষ ঘটনা নয়, আবার এটি প্রথমও নয়। আবার বিচার কাজের এমন গতি ও স্বাধীনতাকে স্বাভাবিক ভাবছেন কিছু চালাক-চতুররা।আইনমন্ত্রী বলেছেন, পরিস্হিতি সামাল দিতে বিচারককে বদলি করা হয়েছে। তার কথার মধ্যে ভালো বার্তা রয়েছে আউয়ালের মতো ক্ষমতাবানদের জন্য। সেটি হচ্ছে, ভবিষ্যতে অন্য কোন জেলায়ও বিশৃঙ্খল আর জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারলে আসামির জামিন আর বিচারকের তাৎক্ষণিক বদলি নিশ্চিতের দীক্ষা ও প্রেরণা। আরেকটি কথা এখানে উহ্য না রাখা ভালো। পিরোজপুরের ঘটনা একদিনে তৈরি হয়নি। এটা একটা ফলাফল বা ক্রিয়ার বিপরীত প্রতিক্রিয়া মাত্র। মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের কথায় আরো অনেক তথ্য এসেছে। প্রশ্ন জেগেছে। সংবাদ সম্মেলনে আউয়াল বলেছেন, আইনগতভাবে তার জামিন পাওয়ার অধিকার থাকলেও পিরোজপুর-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের হস্তক্ষেপে বিচারক তার এবং তার স্ত্রীর জামিন আবেদন না মঞ্জুর করেছেন। মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের হস্তক্ষেপে বিচারক আওয়ামী লীগ নেতার জামিন দেননি। কতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য! তার কথাকে গুরুত্ব দিলে প্রশ্ন আসে, তা’হলে কার হস্তক্ষেপে বিচারককে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে? কার হস্তক্ষেপে চারঘন্টার ব্যবধানে নতুন করে রায় দিয়ে তাকে জামিন দেয়া হয়েছে? প্রশ্ন থাকলেও জবাব নেই কোথাও।বহুদিন ধরেই ভাঙা রেকর্ড বাজছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথকীকরণ নিয়ে। ১৯৯৯–এর মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পর কত সরকার এল–গেল, কিন্তু কিছুই হলো না। বিচার বিভাগ স্বাধীন ও পৃথক না হওয়ার কত যে খেসারত দিচ্ছে বিএনপির নেতারা, তার পুরো ফিরিস্তি বলা অসম্ভব। তবে এককথায় বলা যায় অর্ধশতাধিক মামলা খাননি এমন কোনো ব্যক্তি বিএনপির নেতৃত্ব পর্যায়ে এখন নেই। সরকার বদল হলে আজকের আওয়ামী লীগের নেতাদের কপালে মামলার সেঞ্চুরি- ডাবল সেঞ্চুরি জোটে কি-না, কে জানে? হয়তো বিচারপতিরাও বাদ পড়বেন না। সাবেক বিচারপতি এমন কি প্রধান বিচারপতিরও মামলা খাওয়ার রেকর্ড তো এরইমধ্যে আমরা দেখেছি। এই আউয়ালরাই বারবার উপরমহল থেকে পুরষ্কৃত হন। আবার গলা ফাটিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মঞ্চ কাঁপান। ভাষণ শেষে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগানে আকাশ-বাতাস কাঁপান। যে কারণে সামনে আরো অনেক কিছু দেখার শঙ্কা আছে কারো কারো। সরকারি দলের নেতাকে জেলে পাঠানোর আদেশের পর পিরোজপুরের বিচারককে এভাবে বদলি এবং রায়ও পাল্টে জামিনের ঘটনাকে বিচার ব্যবস্থার জন্য অশনি সঙ্কেতও বলতে চান কেউ কেউ। আবার কেউ বলতে চান পিরোজপুরের এই কাণ্ডে বিচারবিভাগের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। আর গত বছর কয়েকের নমুনায় কিছু বাস্তববাদীদের ধারনা কিছুই হয়নি। পিরোজপুরের ঘটনা দুঃখজনক হলেও দুর্ঘটনা নয়। বিচার-আচার বিষয়ক মন্দঘটনা শুধু পিরোজপুর দিয়েই শুরু নয়। আবার শেষও নয়। রাজনৈতিক দাবড়ানির প্রশ্নেও এটি একেবারে নতুন ঘটনা নয়। তাদের কাছে বিচার বিভাগ হচ্ছে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের একটি শাখা। আইন-বিচার ক্ষমতার অধীনে চলে গেছে বলে বিশ্বাস তাদের। তারা ভবিষ্যতে এর চেয়েও ভিন্ন কিছু ঘটলে মোটেও অবাক না হওয়ার পক্ষে। রায় ঘোষণার পর বিচারকের দেশ ছেড়ে পালানো, একজন প্রধান বিচারপতিকে নাস্তানাবুদ করে চিকিৎসার নামে দেশছাড়া করার ঘটনা বেশিদিন আগের নয়। ওইসব ঘটনায় বর্তমান সরকার বা আওয়ামী লীগ কারোই কোন ক্ষতি হয়নি। বরং শাসন পাকাপোক্ত করার ক্ষেত্রে বরং আরেক ধাপ এগিয়েছে।সরকার-দল অসন্তুষ্ট হয়-এমন কাজে বিরত থাকার ম্যাসেজটা কবুল করেছেন বাদবাকিরা। আইনমন্ত্রী সেটা আরো খোলাসার চেষ্টা করেছেন। এর সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্ন এলেও সুস্থ রাজনীতি বা দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্ন নেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক-বিচারপতিদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে, করবে-এটাই স্বাভাবিক। তারা রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করবেন, মাঝেমধ্যে কিছু দুর্গতিও পোহাবেন-এই সত্যটা মানলেই হয়ে যায়। এটা দোষ-গুণের বিষয় নয়। স্বাভাবিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া। আর রাজনৈতিক বিবেচনায় যোগ্যতা-অযোগ্যতার মানদণ্ড কম-বেশি সবারই জানা। এছাড়া, বিচার বিভাগ কতোটা স্বাধীন? বিচারকসহ বিচার কাজে সম্পৃক্তরাই বা কদ্দূর স্বাধীন?- নানা ঘটনায় উস্কে দিলেও এসব প্রশ্ন এখন অনেকটাই মূল্যহীন। ধারনা করা যায়, এরপরও পিরোজপুর বিষয়ক আলোচনা-সমালোচনা ক’দিনেই থেমে যাবে। আরেকটা ঘটনা বা ইস্যু না আসা পর্যন্ত এ নিয়ে কথামালা হবে। ফল বা সুফল কি হবে জানার বাকি নেই কারোই। বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে বিনোদনের জায়গায় এনে ঠেকানো হয়েছে আরো আগেই। এখন ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ প্রচলিত আদালতে বিচার না পেয়ে আল্লাহর কাছে বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনে। আলামতটি সুবিধার নয়। কারণ দেশে এতো আইন-আদালত, বিচারালয়, বিচারক-বিচারপতি, উকিল-মোক্তার থাকতে তাদের প্রতি আস্থা হারিয়ে দেশের সাধারণ মানুষদের এখন ন্যায় বিচার পাওয়ার আশায় আল্লাহর কাছে চাওয়ার তাড়না তৈরি হওয়া ভালো ইঙ্গিত বহন করে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
rintuanowar@gmail.com

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরো সংবাদ




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close